বুধবার , ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

❒ রংপুরে শিক্ষক গণপতিকে সপরিবারে খুন নিয়ে পুলিশের ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

ডোপ টেস্টে নেগেটিভ, ইয়াবা সেবনের গল্পটি ছিল পুলিশের!

❒ টেস্টের ‘সময়-ব্যবধানের’ প্রশ্ন কেন তুলছেন মহানগর ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী

প্রকাশ : সোমবার, ৩১ আগস্ট , ২০২৬, ০৪:০৭:০০ পিএম , আপডেট : সোমবার, ৩১ আগস্ট , ২০২৬, ০৭:৪১:৪৬ পিএম
সুনীল ঘোষ:
Shornolota_2026-08-31_6a9581bc89da6.JPG

❒ গ্রেপ্তার দুজন ছবি:

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের ফল নেগেটিভ এসেছে। তাঁদের প্রস্রাবের নমুনায় ইয়াবা, গাঁজা বা অন্য কোনো মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

ডোপ টেস্টের এই ফল প্রকাশের পর তদন্তের শুরুতে পুলিশের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পুলিশের পক্ষ থেকে আসামিদের মাদকাসক্ত থাকার দাবি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদক সেবনের যোগসূত্রের কথা বলা এবং দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার ও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পাওয়ার বিষয়গুলো এখন একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—যে মাদক সেবনকে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত করেছিল, সেই দাবির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ঘটনার পরপরই করা হলো না কেন?

‘দ্রুত সাফল্য’—কিন্তু বৈজ্ঞানিক যাচাই কোথায়?

হত্যাকাণ্ডের পরপরই আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার কথা জানায় পুলিশ। তদন্তের শুরুতেই পুলিশ যদি আসামিদের মাদকাসক্ত থাকার বিষয়টি সামনে এনে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—তখনই তাঁদের ডোপ টেস্ট করানো হলো না কেন?

তখন পরীক্ষা করা হলে ঘটনার সময় বা তার কাছাকাছি সময়ে মাদক গ্রহণের বিষয়ে অন্তত একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া যেত। কিন্তু সেই পরীক্ষা করা হলো হত্যাকাণ্ডের প্রায় নয় দিন পর।

ফলে এখন তদন্তের সময়ক্রম নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। আগে গ্রেপ্তার, এরপর জবানবন্দি, আর তারও পরে ডোপ টেস্ট—কেন এমন ক্রম?

১৬৪ ধারার জবানবন্দি কি একাই যথেষ্ট?

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করে না। জবানবন্দিতে বলা তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষ্য, যোগাযোগের তথ্য এবং অন্যান্য স্বাধীন প্রমাণের মিল থাকা জরুরি।

এখানেই ডোপ টেস্টের সময় নিয়ে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

যদি মাদক সেবন হত্যাকাণ্ডের সময়কার ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকে, তাহলে জবানবন্দির বক্তব্যের সঙ্গে সেই দাবির বৈজ্ঞানিক যাচাইও তো জরুরি ছিল।

‘পাওয়া গেলে তো হতো’—কিন্তু পরীক্ষা হলো নয় দিন পর

মহানগর ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘কারাগার থেকে নমুনা সংগ্রহের পর তা পরীক্ষা করে এমফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরীক্ষায় কোনো মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলে তো হতো।’

তাঁর এই বক্তব্যের পরই আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে—পাওয়া যাবে কি না, সেটি যাচাই করার সবচেয়ে কার্যকর সময় কি নয় দিন পর, নাকি ঘটনার পরপরই?

চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিভিন্ন মাদক শরীরে শনাক্ত থাকার সময়সীমা এক নয়। কয়েক দিন পর প্রস্রাবের নমুনায় কিছু মাদক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই নয় দিন পর ডোপ টেস্ট নেগেটিভ হওয়া মানেই যে ঘটনার সময় আসামিরা মাদক সেবন করেননি—তা বলা যায় না।

কিন্তু একই কারণে আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসে—যদি সময়ের ব্যবধান পরীক্ষার ফলকে প্রভাবিত করতে পারে বলে জানা থাকে, তাহলে ঘটনার পরপরই নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি কেন?

এখন কেন ‘সময়-ব্যবধানের’ প্রশ্ন?

হত্যাকাণ্ডের সময় আসামিরা মাদকাসক্ত ছিলেন কি না, সেটি যদি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ ঘটনার প্রায় নয় দিন পর নমুনা নেওয়ার কারণে এখন বলা হচ্ছে, নেগেটিভ ফল দিয়ে ঘটনার সময়কার অবস্থা নিশ্চিত করা যাবে না।

এতে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—তদন্তের শুরুতেই যে বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা সম্ভব ছিল, সেটি পরে কেন করা হলো?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। কারণ বিষয়টি শুধু ডোপ টেস্টের ফল নেগেটিভ হওয়ার নয়; বরং তদন্তের সিদ্ধান্তগুলো কোন সময়ে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে এবং কী উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল—সেটির স্বচ্ছতার প্রশ্ন।

পুলিশের বক্তব্য বনাম প্রমাণ—কোনটি শেষ পর্যন্ত টিকবে?

তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী বলেন, ডোপ টেস্টের রিপোর্ট মামলার নথির অংশ হিসেবে আদালতে জমা দেওয়া হবে। তদন্তের অন্যান্য তথ্য-উপাত্তও যাচাই করা হচ্ছে।

এটি তদন্তের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর করতে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে স্বাধীন প্রমাণের সামঞ্জস্য দেখানো।

আসামিরা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার কতটুকু ঘটনাস্থলের আলামতের সঙ্গে মেলে? হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁদের উপস্থিতির কী কী স্বাধীন প্রমাণ রয়েছে? মাদক সেবনের যে দাবি করা হয়েছে, তার ভিত্তি কী? আর ঘটনার পরপরই ডোপ টেস্ট না করার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর যত স্পষ্ট হবে, তদন্তের ওপর আস্থাও তত বাড়বে।

সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব এখন তদন্তকারীদের

মামলা ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ আগস্ট রাতে মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়িতে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা দেবী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হয়। ২২ আগস্ট তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানায়।

আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের সময় মাদকাসক্ত থাকার বিষয়টি সামনে আসার পর ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নেয় পুলিশ। আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর গত ৩০ আগস্ট রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে দুই আসামির প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের কারাগার থেকে বাইরে নেওয়া হয়নি। রংপুর মেডিকেল কলেজের ল্যাবের টেকনোলজিস্ট ও সহকারী ডিবি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি না পাওয়ায় তদন্তের একটি প্রশ্নের উত্তর মিলেছে—কিন্তু একই সঙ্গে আরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে: ঘটনার পরপরই পরীক্ষা না করিয়ে নয় দিন পর কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পুলিশের প্রাথমিক দাবি, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং নেগেটিভ ডোপ টেস্ট—এই তিনটি তথ্যকে পাশাপাশি রেখে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ থাকাটাই স্বাভাবিক।

শেষ পর্যন্ত তদন্তের সাফল্য প্রমাণ হবে কত দ্রুত আসামি ধরা হয়েছে বা কত দ্রুত জবানবন্দি পাওয়া গেছে—তা দিয়ে নয়; বরং সেই জবানবন্দি ও পুলিশের দাবিকে কতটা স্বাধীন, বৈজ্ঞানিক ও বস্তুগত প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা দিয়ে।

আরও খবর

Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
🔝