বুধবার , ২৪ জুন ২০২৬ , ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)
যশোরের রাজারহাটে পানির দামে বিকোচ্ছে চামড়া

❒ সিন্ডিকেটের নতুন অস্ত্র ‘করোনা-পক্স’,-অসহায় খুচরা বিক্রেতাদের পাশে নেই প্রশাসন!

প্রকাশ : শনিবার, ৩০ মে , ২০২৬, ০৭:৫১:০০ পিএম
সুনীল ঘোষ:
Shornolota_2026-05-30_6a1aebde46b66.JPG

❒ সংগ্রহীত ছবি:

সকাল থেকেই যশোরের রাজারহাটে ছোট ছোট ট্রাক, ভ্যান আর ইজিবাইকে করে চামড়া আসছিল। ঈদে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে কিছু লাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দুপুর গড়াতেই তাদের মুখে নেমে আসে হতাশার ছাপ। খুচরা বিক্রেতা ঠকানোর কৌশল রুখে দিতে পারতো পশু সম্পদসহ প্রশাসন। তবে সে ব্যবস্থা না থাকায় সুযোগ নিলো আড়তদাররা। 

আড়তদাররা চামড়া হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছেন, তারপরই নতুন এক রায়—‘করোনা’, ‘পক্স’, ‘লাম্পি স্কিন’। এই তকমা লাগিয়ে অনেক চামড়াকেই বাতিল ঘোষণা করা হচ্ছে। আর তাতেই ৩০০-৩৫০ টাকায় কেনা গরুর চামড়ার দাম নেমে আসছে ২০০ কিংবা ৩০০ টাকায়। কোথাও কোথাও তারও কম।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে কোরবানির ঈদের পর প্রথম হাটে এমন চিত্রই দেখা গেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীদের অনুপস্থিতির সুযোগে স্থানীয় আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। নতুন করে ‘করোনা’ ও ‘পক্স’ শব্দ ব্যবহার করে তারা চামড়া বাতিল দেখিয়ে পানির দামে কিনে নিচ্ছেন।

খুলনার বটিয়াঘাটা থেকে ৫০টি চামড়া নিয়ে এসেছিলেন স্বপন দাস। এলাকা থেকে তিনি প্রতিটি চামড়া ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় কিনেছেন। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত কোনো আড়তদারই সেভাবে দাম বলতে রাজি হননি।

স্বপন দাস ও বিনয় দাসের কণ্ঠে তখন ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব। তাদের ভাষায়, “আড়তদাররা কচ্চে, চামড়ার করোনা হয়েছে। আমি তো বাপু করোনা বুজদিচিনে। কিন্তু কেউ দামও কচ্চে না।”

একই অভিযোগ মাগুরার ভাঙ্গুরা থেকে আসা মহানন্দ অধিকারীরও। তার কথায়, বাজারে চামড়ার ন্যায্য দাম নেই।

মণিরামপুর উপজেলার ফকির রাস্তা এলাকা থেকে ৬০টি গরুর চামড়া নিয়ে এসেছিলেন স্বদেশ দাস। তিনি জানান, প্রতিটি চামড়া গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় কিনেছেন। অথচ হাটে এসে শুনছেন, এসব নাকি লাম্পি স্কিন, করোনা কিংবা পক্স আক্রান্ত পশুর চামড়া। ফলে আড়তদাররা ২০০ টাকার বেশি দাম দিতে রাজি নন।

হাটে ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চামড়ার স্তূপের পাশে বসে আছেন। অন্যদিকে আড়তদাররা চামড়ার গায়ে ছোটখাটো স্পট দেখিয়ে রোগাক্রান্ত বলে দাবি করছেন। এমনই একজন বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন। তার দাবি, অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী রোগাক্রান্ত চামড়া চিনতে না পেরে বেশি দামে কিনে এখন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, হাটের এত চামড়াই যদি লাম্পি স্কিন আক্রান্ত হয়, তাহলে কোরবানির আগে এসব পশু বিক্রি হলো কীভাবে?

কেশবপুর থেকে বাজার যাচাই করতে মাত্র আটটি গরুর চামড়া নিয়ে এসেছিলেন সঞ্জয় দাস। তিনি জানান, আটটি চামড়া মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। অথচ প্রতিটি চামড়ার ক্রয়মূল্যই ছিল প্রায় ৩০০ টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে লবণের খরচ। ফলে শুরুতেই লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি।

অভয়নগরের কোটাপাড়া থেকে রামপদ ও বিকাশচন্দ্র দাস ২৫টি গরুর চামড়া এবং ৪০টি ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছিলেন। ছাগলের চামড়া ২০ টাকা করে বিক্রি করতে পারলেও গরুর চামড়ার ক্রেতা পাচ্ছিলেন না। তাদের অভিযোগ, ঢাকা ও বাইরের ব্যবসায়ীরা না আসায় স্থানীয় আড়তদাররা এককভাবে দাম নির্ধারণ করছেন।

অবশ্য আড়তদারদের বক্তব্য ভিন্ন। বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল মজিদ পলাশ বলেন, নষ্ট বা লাম্পি স্কিন আক্রান্ত চামড়ার দাম কম হলেও ভালো চামড়া ভালো দামেই বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, ঈদের দিন থেকে এ পর্যন্ত তিনি তিন হাজার চামড়া কিনেছেন, যার দাম পড়েছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে।

তবে লাম্পি স্কিন রোগের ব্যাপক উপস্থিতির দাবির সঙ্গে একমত নন যশোর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ফারুক হোসেন। তার ভাষ্য, যশোরের বিভিন্ন পশুহাট ঘুরে তেমন কোনো রোগাক্রান্ত পশু দেখা যায়নি। তিনি মনে করেন, রোগাক্রান্ত পশু কেউ জেনে-শুনে কোরবানি দেওয়ার কথা নয়।

একই সুর নিয়ামত হোসেনের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “হাটের বেশিরভাগ চামড়া যদি ল্যাম্পি স্কিন আক্রান্ত বলা হয়, তাহলে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটি মূলত চামড়া ব্যবসায়ীদের কারসাজি।”

এদিকে বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, ঈদের মাত্র দুদিন পর প্রথম হাট হওয়ায় বাজার পুরোপুরি জমেনি। এদিন বাতিল বা অসুস্থ গরুর চামড়া ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং ভালো চামড়া ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাইরের ব্যবসায়ীরা এলে পরবর্তী হাটগুলোতে বাজার চাঙ্গা হবে বলে আশা করছেন তিনি।

রাজারহাটের ইজারাদার রাজু আহমেদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের হাটে প্রায় ১০ হাজার গরুর চামড়া ও কয়েক হাজার ছাগলের চামড়া এসেছে। সব মিলিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকার চামড়া কেনাবেচা হয়েছে।

তবে দিন শেষে রাজারহাট ছেড়ে বাড়ি ফেরার সময় অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মুখে একটাই প্রশ্ন—চামড়ায় সত্যিই কি ‘করোনা’ আর ‘পক্স’ ছিল, নাকি দাম কমানোর জন্য নতুন কোনো সিন্ডিকেটের খেলা?

আরও খবর

Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
🔝