| শিরোনাম |
❒ জীবনের শেষ ও চূড়ান্ত সাধনা পরিপূর্ণ
❒ যশোর মেডিকেল কলেজে দেহ হস্তান্তর পরিবারের
❒ মৃত্যুর পরও মানুষের জন্য দেহদান আরজুর ছবি:
আজাদুল কবির আরজু ছিলেন সেই মানুষদের একজন, যাদের জীবন নিজেই এক গল্প। যিনি আজীবন আর্তমানবতার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, মৃত্যুর পরও সেই দায়বদ্ধতা থেকে সরে যাননি। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, নিজের দেহ দান করে তিনি প্রমাণ করলেন—মানুষের কল্যাণই ছিল তার জীবনের শেষ ও চূড়ান্ত সাধনা।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুর ১টার দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে যশোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই নিরহংকারী উন্নয়নকর্মী। বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। আসরবাদ যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে জানাজা শেষে তার মরদেহ যশোর মেডিকেল কলেজের শরীরতত্ত্ব বিভাগে হস্তান্তর করা হয়। এক দশক আগেই পরিবারের সম্মতিতে মরণোত্তর দেহদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বজনরা তার সেই সিদ্ধান্তকে সম্মানের সঙ্গে বাস্তবায়ন করেন।
১৯৫৩ সালের ২৮ আগস্ট যশোর সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া আরজু ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হয়ে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেন তিনি। ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পান এই সাহসী সন্তান। যুদ্ধের সেই অভিজ্ঞতা তাকে আজীবনের জন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল।
১৯৭৫ সালে সমমনা বন্ধুদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘জাগরণী চক্র’। সমাজের অবহেলিত হরিজন ও দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র দিয়ে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ দেশের ৫২টি জেলায় বিস্তৃত। প্রায় ১১ লাখ মানুষের কল্যাণে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে কর্মরত আছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ।
আরজু রেখে গেছেন স্ত্রী ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী। তার ভাই সাংস্কৃতিক কর্মী হারুন অর রশিদ জানান, পারিবারিক মিলন মেলায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
যশোরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। জানাজার মাঠ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই আলোচনায় ছিল তার নির্মোহ, নিরহংকারী জীবনের গল্প। জীবনে যেমন মানুষের উন্নয়ন নিয়ে ভেবেছেন, মৃত্যুর পরও নিজের দেহ দান করে আজাদুল কবির আরজু সমাজকে দিয়ে গেলেন এক অনন্য মানবিক শিক্ষা।