| শিরোনাম |
❒ যশোরে টানা শীতের দাপটে জনজীবন বিপর্যস্ত
❒ শীতের হাত থেকে বাঁচতে খড়-কুটো জ্বালিয়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টা ছবি:
যশোরে টানা শীতের দাপটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরপর দুই দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ডের পর তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও শীতের তীব্রতা কমেনি। কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের।
“শীত তো আর গায়ে লাগে না ভাই, সোজা হাড়ে ঢুকে যায়”—বলছিলেন শহরের এক ভাসমান মানুষ, নাম বলতে চাননি।
রোববার (৪ জানুয়ারি) যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে শ্রীমঙ্গলে ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর আগে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার টানা দুই দিন যশোরেই ছিল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এই টানা শীতে সবচেয়ে দুর্বিষহ অবস্থায় পড়েছেন ছিন্নমূল, ভবঘুরে ও দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো।
“আমাদের তো শীত এলে ছুটি নাই, অসুখ এলে ছুটি নাই”—বললেন বলাডাঙ্গা এলাকার এক দিনমজুর লুৎফর রহমান ও তার সহকর্মী রিয়াজউদ্দিন।
যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শনিবার ভোরে তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্রবার ছিল ৮ ডিগ্রি, আর বৃহস্পতিবার নেমে আসে ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে—যা ছিল দেশের সর্বনিম্ন।
শনিবার রাত থেকেই চারদিকে ঘন কুয়াশার চাদর। রোববার ভোরে কুয়াশায় ঢেকে যায় পুরো শহর। সূর্য উঠলেও আলো ছিল ম্লান, গায়ে লাগার মতো উষ্ণতা নেই।
“সূর্য উঠলেও মনে হয় আগুন নিভে গেছে”—বলছিলেন রেলস্টেশনের পাশে রাত কাটানো বৃদ্ধ আতাউর রহমান।
বেলা বাড়লে কুয়াশা কিছুটা সরে যায়, রোদের দেখা মেলে। কিন্তু শীত থেকে যায়। ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। মোটা জ্যাকেট, মাফলার জড়িয়ে মানুষজনকে জবুথবু হয়ে চলতে দেখা যায়। অনেকেই ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ।
শহরের নাজির শংকরপুর এলাকার রিকশাচালক মোহাম্মদ আলী ও গ্যারেজ মিস্ত্রি রিয়াজ বলেন, শীতে রিকশা চালানো যেমন কষ্টকর হয়ে উঠেছে, তেমনি গ্যারেজে কাজ করাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সকাল আর রাতে ঠান্ডা বাতাসে শরীর অবশ হয়ে আসে। যাত্রীও কম।
“রিকশা না চালাইলে চুলা জ্বলে না, তাই কাঁপতে কাঁপতেই রাস্তায় নামি”—তার কণ্ঠে জমে থাকা অসহায়ত্ব।
সদরের বলাডাঙ্গা কাজীপুর এলাকার শ্রমিক রহিম আলী জানান, টানা চার দিন কাজ পাননি। শনিবার আধবেলা কাজ করে যে সামান্য টাকা পেয়েছেন, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালিয়েছেন।
“আজ কী হবে জানি না, আল্লাহ ভরসা”—বলেই চুপ করে যান রহিম।
প্রচণ্ড শীতে শুধু গরম কাপড়ে কাজ হচ্ছে না। তাই কাঠের টুকরো, খড়কুটো, কাগজ জ্বালিয়ে শহর ও গ্রামে আগুন পোহাতে দেখা যাচ্ছে মানুষকে। রেলস্টেশন, বাসটার্মিনাল, অফিস-আদালতের বারান্দায় রাত কাটানো মানুষগুলো আগুনের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে থাকেন।
“এই আগুনটাই আমাদের কম্বল”—মৃদু হাসিতে বললেন এক ভবঘুরে।
শীতের এই দাপটে যশোরের আকাশ শুধু কুয়াশায় ঢাকা নয়—ঢাকা পড়ে যাচ্ছে অসংখ্য নিঃশব্দ কষ্ট, না বলা আর্তনাদ আর বেঁচে থাকার লড়াই।
ফার্নিচার ব্যবসায়ী নিকমাল হোসেন বলেন-অর্ডার নিয়ে ঠিকমতো সাপ্লাই করতে পারছি না। রং মিস্ত্রিরা স্প্রিটে হাত দিতে সাহস পাচ্ছে না।
সমাজ সচেতন মহল বলেন- একটু উষ্ণতা, একটু সহানুভূতি—এই মানুষগুলোর জন্য সেটাই সবচেয়ে বড় আশ্রয়।