শিরোনাম |
❒ রিকশার চাকায় ওড়না দুর্ঘটনা
রিকশার চাকার সাথে ওড়না পেঁচিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত এইচএসসি পরীক্ষার্থী সুমাইয়া ছায়া ঢাকার একটি হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। শুক্রবার দুপুর যশোর শহরের দড়াটানা থেকে বোনের বাড়ি খড়কি যাওয়ার পথে ওড়না আচমকা রিকশার চাকার সাথে তার ওড়না পেঁচিয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডেই ওড়না গলায় পেচিয়ে পড়ে যায় রিকশার পাদানির ওপর। মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন তিনি। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাত ১ টায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়েছে।
তিনি যশোর সদর উপজেলার দোগাছিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
তার সাথে একই রিক্সায় থাকা দুলাভাই রোকন জানান, শুক্রবার সকালে গাইনী সমস্যার কারণে ডাক্তার দেখাতে ছায়া হিজাব পরে তার সাথে বের হন। যশোর ইবনে সিনা হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর সময় হিজাবটি খুলে গলায় জড়িয়ে নেন ওড়না হিসেবে। সেখান থেকে খড়কি ফেরার পথে শিল্পকলা একাডেমির সামনে পৌছাতেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা দ্রুত ওড়না কেটে ছায়াকে উদ্ধার করেন। তখন মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল, ঘাড়ের এক পাশে মারাত্মক আঘাত লেগেছিল। প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে তার চিকিৎসা সম্ভব হয়নি। পরে দ্রুত ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়, এবং সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার ধানমন্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে সুমাইয়ার অপারেশন করেন মিটফোর্ড হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের ব্রেইন ও স্পাইন বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. ফিরোজ আহমেদ আল-আমিন।
ডাক্তার আল আমিন জানান, মূলত দুর্ঘটনায় সুমাইয়ার মেরুদণ্ড ছিঁড়ে পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়। একইসাথে তার স্পাইনাল কর্ডও ছিঁড়ে যায়, যা অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক অবস্থায় রুপ নেয়। প্রথমে তাকে যশোরের ইবনে সিনা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন তিনি। পরবর্তীতে সুমাইয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার মেরুদণ্ডের হাড়গুলো সংযুক্ত করা হয়। তবে স্পাইনাল কর্ড ছিঁড়ে যাওয়ায় তা আর জোড়া লাগানো সম্ভব হয়নি, এর কোনো চিকিৎসা নেই বলেও জানান চিকিৎসক আল-আমিন। তিনি বলেন, স্পাইনাল কর্ড ঘাড়ের ৫ ও ৬ নম্বর হাড়ের জায়গায় দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ায় সুমাইয়ার শরীরের ঘাড়ের নিম্নাংশ এর কোনো পেশিই আর কখনো কাজ করবে না। এমনকি প্রসাব ও পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে সুমাইয়া। গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিড়ে অকেজো হয়ে যাওয়ায় তার স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়ায় কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত রোববার রাতে অপারেশনের পর সুমাইয়ার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। ১৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর সোমবার তাকে বেডে স্থানান্তর করা হয় এবং সে সময় সে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাও বলেন। কিন্তু পরে হঠাৎ করে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। মঙ্গলবার রাত ১২টার পর তাকে আবার পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, তার ফুসফুসে পানি জমেছে এবং অক্সিজেন লেভেল মারাত্মকভাবে কমে গেছে। একপর্যায়ে মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তার শারীরিক অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কাজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ছায়ার বড় বোন শোভা জানান, বেডে শুয়ে ছায়া ইশারায় জিজ্ঞাসা করছিল, আমার হাত-পা কেন নড়ছে না? আমি কিভাবে লিখবো, কিভাবে পরীক্ষায় যাব? এরপর কান্নায় ভেঙে পড়েন। ধীরে ধীরে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তার অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা মেনে নিতে পারছে না পরিবার। হাসপাতালে ছায়ার মা মিনি বেগম ও বড় বোন মিতু বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। হাসিমুখে ঘুরে বেড়ানো ছায়া এখন জীবনের জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। গ্রামের বাড়িতে ছায়ার অসুস্থ বাবা মারফত হোসেন খাওয়া-ঘুম ছেড়ে মেয়ের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে, যখন সহপাঠীরা এইচএসসির বাকি পরীক্ষাগুলো দিচ্ছে, তখন ছায়া হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আর স্বজনেরা বুক ভরা আশা নিয়ে প্রার্থনা করছেন, আবার যেন ছায়া ফিরে আসে, ছায়া যেন ছায়ার মতোই আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।