শিরোনাম |
প্রেম, বেদনা, সংগ্রাম – জীবনকে যিনি পর্দায় এঁকেছিলেন। আজও তার অবিনাশী ছায়া সিনেমাপ্রেমীদের বুকে জ্বালান অনির্বাণ দীপশিখা। বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য নক্ষত্র অভিনয়ের সম্রাট উত্তম কুমারের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ‘ফ্লপ মাস্টার’ হিসেবে তার অভিনয় জীবনের সূচনা হলেও, অদম্য অধ্যবসায় ও অসামান্য প্রতিভার কারণে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠেছিলেন।
ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব, বহুমুখী অভিনয় ক্ষমতা এবং মনস্তত্ত্বের গভীর উপলব্ধি তাকে চলচ্চিত্র তারকার গণ্ডি ছাড়িয়ে এক সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত করেছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার স্মৃতি আজও অম্লান।
মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ১৯৮০ সালের এই দিনে, ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ চলচ্চিত্রের সেটে অসুস্থ হওয়ার পরে কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
অরুণ কুমার চ্যাটার্জি থেকে উত্তম কুমার
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার আহিরীটোলায় এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে অরুণ কুমার চ্যাটার্জি নামে জন্ম হয় এই মহানায়কের। তার বাবা সাতকড়ি চ্যাটার্জি ছিলেন কলকাতার মেট্রো সিনেমা হলের একজন সাধারণ প্রজেকশনিস্ট এবং মা ছিলেন চপলা দেবী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে শিল্পের প্রতি এক সহজাত টান ছিল।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুকুট’ নাটকে অভিনয় করে সোনার পদক জেতা তার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছিল। তিনি প্রথমে চক্রবেড়িয়া হাই স্কুলে এবং পরে সাউথ সাবার্বান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে গোয়েঙ্কা কলেজে ভর্তি হন, যদিও পড়াশোনা আর বেশিদূর এগোয়নি। কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল কলকাতার পোর্টে একটি সাধারণ চাকুরির মাধ্যমে। তার নানি তাকে ‘উত্তম’ নামটি রেখেছিলেন যা পরে তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে ।
‘ফ্লপ মাস্টার’ থেকে ‘মহানায়ক’ হয়ে ওঠার সংগ্রাম
১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মাধ্যমে উত্তম কুমারের অভিনয় জীবন শুরু হয়। তবে তার অভিনীত প্রথম ছবি ‘মায়াডোর’ মুক্তি পায়নি। জীবনের প্রথম পাঁচ বছরে তিনি বক্স অফিসে একটি ছবিও হিট করাতে পারেননি, যার ফলে তাকে ‘ফ্লপ মাস্টার’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। এই সময়টা ছিল তার জীবনের এক কঠিন সংগ্রাম, যখন তার মেধা ও পরিশ্রম বারবার উপেক্ষিত হচ্ছিল। এই ব্যর্থতা তাকে দমাতে পারেনি বরং তার দৃঢ় সংকল্পকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
‘ফ্লপ মাস্টার’ থেকে ‘মহানায়ক’ হয়ে ওঠার সংগ্রাম সত্যিকারের শ্রেষ্ঠত্ব প্রায়শই উল্লেখযোগ্য বাধা অতিক্রম করার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ ছবিতে তিনি প্রথম দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিটি তাকে চলচ্চিত্র জগতে স্থায়ী আসন এনে দেয়। এই ছবিটি শুধু তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার কালজয়ী জুটিরও সূচনা করে।
তার অসাধারণ অভিনয় প্রতিভা, ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব দর্শকদের উপর তার অসামান্য প্রভাবের কারণেই ‘মহানায়ক’ উপাধি দেওয়া হয়। ভারত সরকার ১৯৭৫ সালে তাকে এই উপাধি প্রদান করে, যা ভারতের সংসদে ঘোষিত হয়েছিল।
তিনি কেবল রোমান্টিক নায়ক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না, কমেডি, ট্র্যাজেডি, গোয়েন্দা (যেমন সত্যজিৎ রায়ের 'চিড়িয়াখানা' ছবিতে ব্যোমকেশ বক্সী), এমনকি খলনায়কের (যেমন 'অমানুষ' ছবিতে রাজা সাহেব) মতো বৈচিত্র্যময় চরিত্রেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন। তার এই বহুমুখিতা তাকে বাংলা সিনেমার ‘ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট টাইটান’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে